Farhan's Articles

"Iqra Bismi R abbikaallazi Khalaq" - "Read! In the name of Allah who created all the exists"

logo-icon

টেকসই উন্নয়নে সিমেন্ট কোম্পানির দায়বদ্ধতা অনেক বেশি

147 Views

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক দূর।

হয়তো দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য কাঙ্খিত সোনার বাংলা এখনো গড়া না হলেও ,

আজ আমরা অনেক কিছুতেই সমৃদ্ধ।

আর এই অগ্রযাত্রার মূল শক্তি এদেশের মানুষের অদম্য ও অপ্রতিরোদ্ধ মানসিকতা।

কাঠামোগত নির্মাণ হলো টেকসই উন্নয়নের অন্যতম পূর্ব শর্ত।

সেই দিক থেকে আমরা বেশ জোরে সোরেই আগাচ্ছি।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যে টেকসই উন্নয়নের জন্য এই নির্মাণযজ্ঞ সেই নির্মাণ কাজটাই অনেক ক্ষেত্রে টেকসই হচ্ছেনা।

টেকসই নির্মাণ কাজের প্রধান দুই উপকরণ হলো রড ও সিমেন্ট।

বাংলাদেশ এখন উভয় পণ্যই উৎপাদনে স্বাবলম্বী।আমাদের ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫ টি রড উৎপাদনকারী কোম্পানি ও ৩৭টি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে।

যাতে বছরে প্রায় ৮০লক্ষ টন রড আর ৭ কোটি ব্যাগের মত সিমেন্ট উৎপাদন সম্ভব।

যদিও কারও কারও দাবি এর চেয়ে বেশি ,কিন্তু বাস্তবিক অর্থে তা অসম্ভব বললেই চলে।

এই মুহূর্তে আমাদের বছরে প্রায় ৫৫ লক্ষ থেকে ৬০ লক্ষ টন রড আর সাড়ে তিন কোটি টনের মত সিমেন্টের চাহিদা আছে,

তাই বলাই যায় চাহিদার তুলনায় যোগান ভরপুর আছে।

রডের মার্কেটের প্রায় ৭০% নিয়ন্ত্রণ করছে বিএসআরএম,একেএস,কেএসআরএম,জিপিএইচ,রহিম স্টিল ও আনোয়ার ইস্পাত, এই ছয়টি কোম্পানি।

যাদের রডের মানও গুনগত সম্পন্ন।

অর্থাৎ,আমাদের ডিজাইন ইঞ্জিনিয়াররা রডের ক্ষেত্রে যে ইল্ড স্ট্রেংথ ধরে ডিজাইন করে তা উক্ত কোম্পানি গুলো অত্যান্ত কঠোরতার সাথেই বজায় রাখে।

বাকিরাও ধীরে ধীরে মানসম্পন্ন রড উৎপাদনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।

তাই টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে রড নিয়ে আমরা অনেকটাই নিরাপদ অবস্থাতেই আছি।

চিন্তা হচ্ছে, অবকাঠামোতে রডকে ঢেকে রাখবে বা আগলে রাখবে যেই কংক্রিট,সেই কংক্রিটের মান নিয়ে।

আমাদের দেশে কংক্রিটের মানের অবস্থা খুবই খারাপ।

সিংহভাগ সাধারণ নির্মাণ কাজে যেমন ব্যক্তিগত বাড়িঘর, মসজিদ,স্কুল, রাস্তাঘাট ইত্যাদি কাজে কংক্রিটের মানের অবস্থা একেবারেই নাজেহাল।

এছাড়াও সাধারণ সরকারি-আধা সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণ কাজে ঠিকাদারদের অবহেলা কিংবা দুর্নীতির কারণেও চিত্রটা একই।

সাধারণ, ১:২:৪ কিংবা ১:১.৫:৩ অনুপাত বজায় রেখে বেশিরভাগ ছাদ,কলাম,বিম,পাইল,ভিত্তি নির্মাণ করা হচ্ছে।

যা ১০০% সঠিকভাবে মেনে চললেও সর্বোচ্চ ২২০০ থেকে ২৯০০ পিএসআই অর্জন করা সম্ভব।

যেখানে আমাদের দেশের বেশিরভাগ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার ডিজাইন করার সময় কংক্রিটের স্ট্রেংথ ৩০০০ পিএসএই ধরে ডিজাইন করে।

অর্থাৎ ছাদ,কলাম,বিম,পাইল,ভিত্তি এগুলো ঢালাইয়ের সময় সিমেন্ট, বালু ও খোয়ার অনুপাত ১:১.৫:৩ তো রাখতে হবেই ,

তার সাথে আরও বেশ কিছু সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নিলে

যেমন গুনগত মানের সিমেন্ট,ইটের খোয়ার বদলে পাথর,নূন্যতম এফ এম ২.৫ বজায় রাখা বালু,

ভালো পানি,পানি-সিমেন্টের সঠিক অনুপাত,নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঢালাই, ঠিক মতো কিউরিং,

এমনকি কোন ক্ষেত্রে কনস্ট্রাকশন ক্যামিকেল ও ব্যাবহার করে লক্ষ্যমাত্রা ৩০০০ পিএসএই অর্জন করা সম্ভব।

দেশে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন রডের সহজ লভ্যতা ও প্রতিনিয়ত ব্যাবহারের জন্য কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধিতে কড়াকড়ি হওয়া আরও বেশি জরুরি হয়ে গেছে।

রড ব্যাবহার করছেন ৭২৫০০ পিএসআই এর আর কংক্রিটের শক্তি হচ্ছে ২০০০ পিএসএই এমনকি কখনো কখনো তারও কম।

বয়স বাড়লে হাড় থেকে মাংস যেমন ঝুলে যায় ঠিক তেমন ভাবে একটু বয়স হওয়ার সাথে সাথেই স্থাপনাগুলোর অবস্থা তেমন হয়ে যাচ্ছে বা যাবে।

এই উচ্চ শক্তি সম্পন্ন রডের সাথে অবশ্যই কমপক্ষে ৩০০০ পিএসএই এর কংক্রিট ব্যবহার করতে হবে,

যদিও কংক্রিট বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতনামা প্রকৌশলীদের মতে ৭২৫০০ রডের সাথে ৩৫০০-৪০০০ পিএসএই এর কংক্রিটের কম্বিনেশন বা সমাহার থাকা উচিত

আর ৬০,০০০ পিএসআই এর রডের জন্য অন্ততপক্ষে ৩০০০-৩৫০০০ পিএসআই এর কংক্রিট উপযুক্ত।

অতএব,কংক্রিটের শক্তি কমপক্ষে ৩০০০ পিএসএই এখন ফরজের সমান হয়ে গেছে। যার ক্ষেত্রে কোনভাবেই ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।

বাস্তবিকতা অত্যন্ত দুঃখ জনক হলেও সত্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব অতিরিক্ত সতর্কতা তো বজায় রাখা দূরের কথা,

ঢালাই-ই হয় ১:২:৪ অনুপাতে আবার এইটাও অনেক ক্ষেত্রে মানে না।

ব্যক্তিগত বাড়ির মালিকেরা কোন কোন ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখলেও অনুপাত ঠিক রাখেনা আবার কেউ অনুপাত ঠিক রাখলেও সতর্কতা মানেনা।

সব মিলিয়ে একটা অত্যান্ত নাজুক ও হযবরল অবস্থার মধ্যে আছে আমাদের দেশের কংক্রিটের অবস্থা,তথাপি নির্মিত অবকাঠামোগুলো।

যা কিনা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে তো আছেই,এমনিতে সাধারণ অবস্থাতেও স্বল্পস্থায়ী হচ্ছে এমনকি ভেঙেও পড়ছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে,

যখনই ঢালাইতে কোন সমস্যা হচ্ছে,

যেমন জমতে দেরি করছে,শক্তি পাচ্ছেনা, সাধা হয়ে যাচ্ছে কিংবা কিছুদিন পর ধ্বসে পড়ছে

তখনই বেশিরভাগ মানুষ দোষ দিচ্ছে কোন না কোন সিমেন্ট কোম্পানির উপর।

আর দেশে উৎপাদনকারী ৩৭টি সিমেন্ট কোম্পানির বেশিরভাগই তাদের সিমেন্টের শক্তি হিসেবে প্রচার করছে ল্যাবরোটরিতে দক্ষ হাতে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বজায় রেখে কিউব টেস্টে পাওয়া রেজাল্টকে,

যা কিনা দেখাচ্ছে ৪০০০ পিএসএই,৫০০০ পিএসএই কেউ কেউ আবার ৬০০০-৭০০০ পিএসএই ও প্রচার করছে।

এতে করে মানুষ দ্বিধায় পরে যাচ্ছে, রাজমিস্ত্রিরা ভুল শিখছে, অনেক প্রকৌশলীরাও কংক্রিট মিক্স ডিজাইনে ভুল করছে।

ফলাফল হিসেবে আমরা পাচ্ছি ঝুঁকিপূর্ণ স্বল্পস্থায়ী নাজুক কংক্রিট।

যদিও গত কয়েক বছর ধরে রেডি মিক্স কংক্রিটের সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে বেশ কিছু কোম্পানি,

কিন্তু এদের ক্রেতার সংখ্যা প্রত্যাশিত ভাবে বাড়ছে না।

বিশেষ করে কোম্পানিগুলো সাধারণ নির্মাণ কাজের মালিকদেরকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে।

এর অবশ্য অন্যতম কারণ হলো তারা বাড়ির মালিকদের বিশ্বাস অর্জন করতে এখনো ব্যর্থ , একই সাথে ঠিকাদারদের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক করতেও অসফল।

হাতে গোনা ২-৩ টি রেডি মিক্স কোম্পানি বাদে বাকিরা অনেকেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে গুনগত মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে খুব একটা সফল হচ্ছেনা।

যারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে সরকারি মেগা প্রজেক্ট বা জাতীয় উন্নয়নে তারা ঠিকই জায়গা করে নিচ্ছে।

সিম ওয়ান-সিম টু নিয়ে কংক্রিট ঘোলা করার টেন্ডেন্সি দিন দিন বেড়েই চলছে।

যেই ট্রাই ক্যালসিয়াম সিলিকেট আর ডাই ক্যালসিয়াম সিলিকেট এর বেশি পরিমানে উপস্থিতি ক্যালসিয়াম সিলিকেট হাইড্রেড বিক্রিয়ার মাধ্যমে সিমেন্টকে

তথাপি কংক্রিটকে করে মজবুত ও শক্তিশালী ,

সেখানে শুধু মাত্র ব্যবসায়িক স্বার্থে শোনানো হয় পোরোসিটি ফিল আপ আর সিলিকনের উপস্থিতির মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি অর্জনের গল্প।

অন্তত পক্ষে ২% মার্কেট শেয়ার আছে এরকম ১৪টি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম যদি বলি ,

শাহ,ফ্রেশ,বসুন্ধরা,লাফার্জ-হোলসিম, ক্রাউন, সেভেনরিং, স্ক্যান, প্রিমিয়ার, আকিজ, আমান, কনফিডেন্স, টাইগার, বেঙ্গল, আনোয়ার এদের দায়িত্বটা অনেক বেশি।

কারণ এরাই মার্কেটের প্রায় ৮৫ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে।

এদের নিজেদের স্বার্থে তথাপি দেশের স্বার্থে উচিৎ তাদের প্রচারণার কৌশলে পরিবর্তন এনে,

নিজেদের সিমেন্টের গুনাগুনের পাশাপাশি গুনগত কংক্রিট কিভাবে তৈরী করা যায় তার উপরে জোর দেয়া।

বিশেষ করে,তাদের যে বিলোও দ্যা লাইন বা মাঠ পর্যায়ের যে সেমিনার-প্রশিক্ষণশালা গুলো হয় ,

সেখানে এর সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে বাড়ির মালিক ,প্রকৌশলী, রাজমিস্ত্রী এদেরকে বুঝতে হবে অভিজ্ঞদের দ্বারা।

তাছাড়া, প্রমোশনাল আইটেম যেমন,ক্যালেন্ডার, লিফলেট, ব্রুসিয়ার, প্রোফাইল এগুলোতেও ছোট ছোট বার্তা দিয়ে দিতে পারে।

এছাড়া, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন,পত্রিকা বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড এগুলোতেও যদি এরা এই বার্তার অন্তর্ভুক্ত করে তাহলে তো ভীষণ ধন্যবাদ।

আর এই বড় বড় কোম্পনিগুলোকে দেখেই কিন্তু ছোট কোম্পানিগুলো আস্তে আস্তে তাদের প্রচারণার বার্তাতে পরিবর্তন আনবে।

কাজেই,আমাদের প্রত্যাশা থাকবে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর প্রতি,

জাতির টেকসই নির্মাণের জন্য গুনগত কংক্রিট তৈরিতে তারা যেন তাদের দ্বায়বদ্ধতা থেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

আমার এই লেখাটি গত ১২ই জুন , ২০২১ এ বাংলা ডেইলি টুয়েন্টি ফর ডট কম এ “টেকসই উন্নয়নে সিমেন্ট কোম্পানির দায়বদ্ধতা অনেক বেশি” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top